বর্তমান সময়ে নারীরা কেমুন, আইন পরিস্থিতি কেমিন


লেখার শুরুতে বর্তমান সময় নারীরা কেমন আছেন, তা একটু ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করছি, যেখানে শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, সারা দেশের নারীদের চোখে‑মুখে ভয়, আতঙ্ক কাজ করেছে। ঘরে বাইরে নারীরা কোথাও নিরাপদ নন। তাই আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করছেন। চাকরি-অফিস-আদালত বা অন্য কোনো কাজে কেউ ঘর থেকে বের হলে, কতক্ষণে আবার ঘরে ফিরবেন, তা নিয়ে পরিবারের সদস্যরা চিন্তায় থাকেন। এই উদ্বেগের কারণ অহেতুক নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে সংগঠিত ধর্ষণের বিভিন্ন ঘটনা রয়েছে এর পেছনে।


এই ধরনের কিছু ঘটনা হলো–গত ১৪ ফেব্রুয়ারিতে শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে এক কিশোরী (১৪) ধর্ষণের শিকার, ১৬ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার ধামরাইয়ে ৯ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ, ২১ ফেব্রুয়ারিতে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য ফুল সংগ্রহ করতে যাওয়া চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ, ১৬ ফেব্রুয়ারিতে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার পুরাতন মাওয়া ফেরিঘাট থেকে ট্রলারে উঠে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পথে এক গৃহবধূ সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার, ২২ ফেব্রুয়ারিতে গাজীপুরের ভোগড়ায় স্টুডিওতে ছবি তুলতে গিয়ে পঞ্চম শ্রেণির এক মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণের শিকার…। এসব সংবাদের অর্থ রাষ্ট্র নারীর নিরাপত্তা দিতে পারছে না। শুধু ফেব্রুয়ারি নয়, বছরের প্রতিটি মাসেই অগণিত ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে।



এবার পরিসংখ্যানের দিকে ফিরে দেখা যাক, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নারী ও কন্যা নির্যাতন বিষয়ক তথ্য থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালে সারা দেশে মোট ১ হাজার ১০৬ জন কন্যা এবং ১ হাজার ৪১৯ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৩৬৭ জন কন্যাসহ ৫১৬ জন। তার মধ্যে ৮৬ জন কন্যাসহ ১৪২ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, ১৮ জন কন্যাসহ ২৩ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে ২০২৫ সালের দ্বিতীয় মাস এখনো শেষ হয়নি। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪২ জন কন্যাসহ ৬৭ জন। তার মধ্যে ১৪ জন কন্যাসহ ২০ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, ১ জন কন্যাসহ ২ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া ২ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।


ধর্ষণের চেষ্টা হলে আত্মরক্ষায় নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া কি অপরাধ?ধর্ষণের চেষ্টা হলে আত্মরক্ষায় নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া কি অপরাধ?


আইনের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইনের ৯(১) ধারা অনুযায়ী, যদি কোন পুরুষ কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহা হইলে তিনি (মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে) দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন। আবার ৯ (২) ধারা অনুযায়ী, যদি কোন ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণ বা উক্ত ধর্ষণ পরবর্তী তাহার অন্যবিধ কার্যকলাপের ফলে (ধর্ষণের শিকার) নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যূন এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন।



আসলে সময়টাই এমন, যেখানে নারীরা পরিবার বা কাছের মানুষের সঙ্গে অবস্থান করেও নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না। এমনকি দূরের পথে যাত্রাকালে বাসে স্বামীর সঙ্গে থাকার পরে ও নারীরা শ্লীলতাহানির পাশাপাশি ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন।


চলতি মাসের ১৭ ফেব্রুয়ারির ঘটনা। টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর থানাধীন এলাকায় ঢাকা থেকে রাজশাহীগামী একটি বাসে ডাকাতি ও নারী যাত্রীদের শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটে। সংবাদসূত্রে জানা যায়, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি রাতে আমারি ট্রাভেলস নামে রাজশাহীগামী একটি বাস গাবতলী থেকে যাত্রা শুরু করে। যাত্রাপথে ডাকাতির উদ্দেশ্যে কয়েকজন অস্ত্রের মুখে ওই বাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। তারা বাসের যাত্রীদের টাকা পয়সা ও মালামাল লুট করে। এ সময় তারা নারী যাত্রীদের গয়না ও টাকা পয়সা লুট করার পাশাপাশি তাদের শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

 


মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও ধর্ষণের মতো অপরাধ থামছে না কেন?মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও ধর্ষণের মতো অপরাধ থামছে না কেন?

এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরব হয়ে ওঠে। এতে দেশের নীতিনির্ধারকেরা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হয়ে ওঠে। যার ফলে পুলিশ শুরুর দিকে মামলা নিতে না চাইলেও পরে মামলা নেয় এবং অপরাধীদের আটক করে।



তবে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ২২ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের জেলা পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান এক সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘সেদিন ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে উত্তরবঙ্গগামী চলন্ত বাসে ডাকাতির ঘটনা ঘটলেও কোনো ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি।’ তিনি আরও জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বাসে শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটতে পারে।


 

প্রতীকী ছবি

কিন্তু সেদিনের বাসে থাকা ভুক্তভোগী এক নারী গণমাধ্যমকে জানান, বাসে রাতে ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটেছে। এবং তিনি নিজেও ডাকাত কর্তৃক শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছেন।



প্রশাসনের এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মাথায় কিছু প্রশ্ন আসে। প্রথমত, প্রশাসন কি ধর্ষণের মতো অপরাধের ঘটনা আড়াল করছে? দ্বিতীয়ত, শ্লীলতাহানিতা কি মূল্যহীন ঘটনা? তাহলে শাক দিয়ে কি মাছ ঢাকার চেষ্টা করা হচ্ছে? কিন্তু শ্লীলতাহানির তো এক প্রকারের নির্যাতন।


ভিডিও দেখুন:


নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০০০‑এর ১০ ধারা অনুসারে, যদি কোন ব্যক্তি অবৈধভাবে তাহার যৌন কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে তাহার শরীরের যে কোন অঙ্গ বা কোন বস্তু দ্বারা কোন নারী বা শিশুর যৌন অঙ্গ বা অন্য কোন অঙ্গ স্পর্শ করেন বা কোন নারীর শ্লীলতাহানি করেন তাহা হইলে তাহার এই কাজ হইবে যৌন পীড়ন এবং তজ্জন্য উক্ত ব্যক্তি অনধিক দশ বৎসর কিন্তু অন্যূন তিন বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন।



সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইমতিয়াজ মাহমুদ ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে বলেন, ‘প্রশাসনের হাতেই সকল ক্ষমতা। তারা চাইলে সঠিক ঘটনা প্রকাশ করবে, আর না চাইলে করবেন না। আইন‑শৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ হলো অন্যায়ের প্রতিকার করা। কিন্তু ঢাকা থেকে রাজশাহীগামী বাসের ঘটনায় পুলিশের মধ্যে মিথ্যা বলার প্রবণতা দেখা গেছে। এ ঘটনায় পুলিশ তো শুরুর দিকে মামলাই নেয়নি। মানুষ যখন এই ঘটনার প্রতিবাদ করেছে, রাস্তায় নেমেছে, তখন পুলিশ মামলা নিয়েছে। পুলিশ দৃশ্যত মিথ্যা বলছে, তার কারণ পুলিশ দেখাতে চায়, সমাজের সার্বিক অবস্থা ঠিকঠাক আছে। প্রশাসনে এই মিথ্যার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’


চলন্ত বাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি, দাবি পুলিশেরচলন্ত বাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি, দাবি পুলিশের

এই আইনজীবীর মতে, ‘এখন মানুষ ডাকাতি করতে গেলে ডাকাতির স্থলে কোনো নারী থাকলে তাকেও ধর্ষণ করছে। যেটা আগে কখনো চোখে পড়েনি। বর্তমানে মানুষের ‘ব্যাটাগিরি’ দেখানোর প্রবণতা বাড়ছে। ধর্ষণের মতো ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও, অপরাধীরা শাস্তি পাচ্ছে না। যদি বছরে কয়েকটা মৃত্যুদণ্ড হতো। আর সেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর গণমাধ্যম আর টেলিভিশনে প্রচার করা হতো, তাহলে অপরাধীদের মধ্যে ভয় কাজ করত।’


আইনজীবী ইমতিয়াজ মাহমুদ মনে করেন, ‘সমাজ থেকে ধর্ষণের মনোভাব চিরতরে নিরাময় হবে, তা অনেক দূরের যাত্রা। অপরাধীরা শাস্তি পেলে হয়তো ধর্ষণের মতো ঘটনা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে। তবে ধর্ষণের ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হবে না। কারণ সমাজ আমাদের পুরুষতান্ত্রিক। পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের কারণে সমাজে ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটছে। পুরুষতন্ত্র প্রমাণ করতে চায় নারী দুর্বল, অধস্তন, ক্ষমতাহীন। তাই নারীকে হেয়প্রতিপন্ন করা যায়। ধর্ষণের প্রধান কারণ হচ্ছে নারীকে শায়েস্তা করা। আর এটাই প্রমাণের জন্যই পুরুষেরা ধর্ষণকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।’



আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)‑এর তথ্য সংরক্ষণ ইউনিটের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালে সারা দেশে ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন মোট ৪০১ জন নারী। এর মধ্যে ধর্ষণ‑পরবর্তী হত্যার শিকার হয়েছেন ৩৪ জন এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন ৭ জন। ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছে ১০৯ জন। এর মধ্যে ধর্ষণের চেষ্টার পর হত্যা করা হয় ১ জনকে।


 

প্রতীকী ছবিটি ফ্রিপিক থেকে নেওয়া

ধর্ষণের মতো অপরাধ আগেও ছিল, এখনও আছে। তবে ইদানীং ধর্ষণের মাত্রা বেড়েছে। বর্তমানে দেশের আইন‑শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। আর এ কারণে ধর্ষণ কমছে না। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক বলেন, ‘নারীর প্রতি সম্মানের যে জায়গা, সেখানে আমরা বারবার পরাজিত হচ্ছি। একজন পুরুষ নারী থেকে জন্মগ্রহণ করলেও একপর্যায়ে গিয়ে সে পুরুষ অন্য নারীকে ধর্ষণ করছে। ধর্ষণ অপরাধে আইনকে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে অপরাধীরা ভয় পায়। ধর্ষণের অপরাধে অপরাধীরা শাস্তি পেলে ধর্ষণের মতো ঘটনা কমবে।’



অধ্যাপক ড. তানিয়া হকের মতে, ‘সমাজ থেকে ধর্ষণের প্রবণতা কমাতে সোশ্যাল মিডিয়াকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব সহজেই ধর্ষণের দৃশ্য দেখছে। এ দৃশ্য মানুষকে উৎসাহিত করছে। তাই সিনেমা বা বিভিন্ন মাধ্যমে এ ধরনের দৃশ্য দেখানো পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি পর্নোগ্রাফি বন্ধ করতে হবে। তা না হলে ধর্ষণের মতো অপরাধ বন্ধ হবে না। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। পাশাপাশি পরিবারে সন্তানকে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মানবিক শিক্ষায় গড়ে তুলতে হবে।

0 মন্তব্যসমূহ

Thanks

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Thanks

Post a Comment (0)

নবীনতর পূর্বতন