আল্লাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা দেন, আর যার থেকে ইচ্ছা ছিনিয়ে নেন

 ছবি



মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তাআলা যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা দেন যার থেকে ইচ্ছা তা ছিনিয়ে নেন। আর এ বিষয়টি রাব্বুল আলামিন আল্লাহ পবিত্র কোরআনুল কারিমের সূরা আলে ইমরানে উল্লেখ করেছেন।


সূরা আলে ইমরান (আরবি ভাষায়: آل عمران‎) মুসলমানদের পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ আল কোরআনের ৩য় সূরা, এর আয়াত সংখ্যা ২০০টি এবং এর রূকুর সংখ্যা ২০টি। সূরাটি মদিনায় অবতীর্ণ হয়েছে।


মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তাআলা বলেন, قُلِ اللّٰہُمَّ مٰلِکَ الۡمُلۡکِ تُؤۡتِی الۡمُلۡکَ مَنۡ تَشَآءُ وَ تَنۡزِعُ الۡمُلۡکَ مِمَّنۡ تَشَآءُ ۫ وَ تُعِزُّ مَنۡ تَشَآءُ وَ تُذِلُّ مَنۡ تَشَآءُ ؕ بِیَدِکَ الۡخَیۡرُ ؕ اِنَّکَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ 

উচ্চারণ: ‘কুল্লিলা-হুম্মা মা-লিকাল মুলকি তু’তিল মুলকা মান তাশাউ ওয়া তানঝি‘উল মুলকা মিম্মান তাশাউ ওয়াতু‘ইঝঝুমান তাশাউ ওয়া তুযিল্লুমান তাশাউ বিইয়াদিকাল খাইরু; ইন্নাকা ‘আলা-কুল্লি শাইয়িন কাদীর’।

অর্থ: ‘তুমি বলো: হে রাজ্যাধিপতি আল্লাহ! আপনি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন এবং যার নিকট হতে ইচ্ছা রাজত্ব ছিনিয়ে নেন; যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন; আপনারই হাতে রয়েছে কল্যাণ। নিশ্চয়ই আপনিই সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান’। (সূরা: আলে ইমরান, আয়াত: ২৬)

পরের আয়াতে আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, تُوۡلِجُ الَّیۡلَ فِی النَّہَارِ وَ تُوۡلِجُ النَّہَارَ فِی الَّیۡلِ ۫ وَ تُخۡرِجُ الۡحَیَّ مِنَ الۡمَیِّتِ وَ تُخۡرِجُ الۡمَیِّتَ مِنَ الۡحَیِّ ۫ وَ تَرۡزُقُ مَنۡ تَشَآءُ بِغَیۡرِ  حِسَابٍ

উচ্চারণ: ‘তূলিজুল লাল্লাইলা ফিন্নাহা-রি ওয়াতূলিজুন্নাহা-রা ফিল্লাইলি ওয়াতুখরিজুল হাইইয়া মিনাল মাইয়িতি ওয়াতুখরিজুল মাইয়িতা মিনাল হাইয়ি ওয়াতারঝুকুমান তাশাউ বিগাইরি হিসা-ব’।  (সূরা: আলে ইমরান, আয়াত: ২৭)

অর্থ: ‘আপনি রাতকে দিনে পরিবর্তিত করেন এবং দিনকে রাতে পরিণত করেন, এবং জীবিতকে মৃত হতে নির্গত করেন ও মৃতকে জীবিত হতে বহির্গত করেন এবং আপনি যাকে ইচ্ছা অপরিমিত জীবিকা দান করেন’।

সূরা আলে ইমরানের শানে-নজুল

মুসলমানদের অব্যাহত উন্নতি ও ইসলামের ক্রমবর্ধমান প্রসার দেখে বদর যুদ্ধে পরাজিত এবং ওহুদ যুদ্ধে বিপর্যস্ত মুশরিক ও অন্যান্য অমুসলিম সম্প্রদায় দিশাহারা হয়ে পড়েছিল। তাই সবাই মিলে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রস্তুত হচ্ছিল। অবশেষে মুশরিক, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের একটি সম্মিলিত শক্তিজোট গড়ে উঠল। তারা সবাই মিলে মদিনার ওপর ব্যাপক আক্রমণ ও চূড়ান্ত যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিল।


সেই সঙ্গে তাদের অগণিত সৈন্য দুনিয়ার বুক থেকে ইসলাম ও মুসলমানদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার জন্য ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে মদিনার চারদিক অবরোধ করে বসে। কোরআনে এ যুদ্ধ ‘গযওয়ায়ে আহযাব’ এবং ইতিহাসে ‘গযওয়ায়ে খন্দক’ নামে উল্লিখিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে স্থির করেছিলেন, শত্রু-সৈন্যের আগমনপথে মদিনার বাইরে পরিখা খনন করা হবে।

নবী করিম (সা.)-ও একজন সৈনিক হিসেবে খননকাজে অংশ নেন। ঘটনাক্রমে পরিখার এক অংশে একটি বিরাট পাথর পাওয়া গেল।

সেটি সাহাবিগণ সর্বশক্তি ব্যয় করেও সরাতে ব্যর্থ হলেন। তারা মূল পরিকল্পনাকারী হজরত সালমান ফারসি (রা.)-কে এই সংবাদ দিয়ে নবী করিম (সা.) এর কাছে পাঠালেন। তিনি তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে এলেন এবং লোহার কোদাল দিয়ে পথরটিকে প্রচণ্ড আঘাত করতেই তা খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে গেল এবং একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ উত্থিত হলো। এ স্ফুলিঙ্গের আলোকচ্ছটা বেশ দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল। নবী করিম (সা.) বললেন, ‘এ আলোকচ্ছটায় আমাকে হীরা ও পারস্য সাম্রাজ্যের রাজপ্রাসাদ দেখানো হয়েছে’। এরপর দ্বিতীয়বার আঘাতে আরেকটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বিচ্ছুরিত হলো। তিনি বললেন, ‘এ আলোকচ্ছটায় আমাকে রোম সাম্রাজ্যের লাল বর্ণের রাজপ্রাসাদ ও দালান-কোঠা দেখানো হয়েছে’। এরপর তৃতীয়বার আঘাত করতেই আবার আলোকচ্ছটা ছড়িয়ে পড়ল। তিনি বললেন, ‘এতে আমাকে সান্আ ইয়ামনের সুউচ্চ রাজপ্রাসাদ দেখানো হয়েছে’। তিনি আরো বললেন, ‘আমি তোমাদের সুসংবাদ দিচ্ছি, জিবরাইল (আ.) আমাকে বললেন, আমার উম্মত অদূর ভবিষ্যতে এসব দেশ জয় করবে’। এ সংবাদে মদিনার মুনাফিকরা ঠাট্টা-বিদ্রূপের একটা সুযোগ পেয়ে গেল। তারা বলতে লাগল, দেখো, প্রাণ বাঁচানোই যাদের পক্ষে দায়, যারা শত্রুর ভয়ে আহার-নিদ্রা ছেড়ে দিনরাত পরিখা খননে ব্যস্ত, তারাই কিনা পারস্য, রোম ও ইয়ামেন জয় করার দিবাস্বপ্ন দেখছে! আল্লাহ এসব নাদান জালিমের জবাবে উপরোক্ত আয়াত নাজিল করেন।

ভালো ও মন্দের নিরিখ

আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে ‘বিয়াদিকাল খাইর’ অর্থাৎ তোমারই হাতে যাবতীয় কল্যাণ নিহিত। আয়াতের প্রথমাংশে রাজত্ব দান করা ও ছিনিয়ে নেওয়া এবং সম্মান ও অপমান- উভয় দিক উল্লেখ করা হয়েছিল। এ কারণে এখানেও ‘বিয়াদিকাল খাইর...’ বলা স্থানোপযোগী ছিল। অর্থাৎ তোমারই হাতে কল্যাণ ও অকল্যাণ নিহিত; কিন্তু আয়াতে শুধু (কল্যাণ) শব্দ ব্যবহার করে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। তা হলো, যে বিষয়কে কোনো ব্যক্তি বা জাতি অকল্যাণকর ও বিপজ্জনক মনে করে, তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা জাতির জন্য আপাতদৃষ্টিতে অকল্যাণকর ও বিপজ্জনক মনে হলেও পরিণামের সামগ্রিক ফলশ্রুতির দিক দিয়ে তা হয়তো মন্দ নয়।

দ্বিতীয় আয়াতে নভোমণ্ডলেও আল্লাহর ক্ষমতার ব্যাপ্তি বর্ণনা করা হয়েছে- ‘আপনি ইচ্ছা করলেই রাতের অংশ দিনে প্রবেশ করিয়ে দিনকে বড় করে দেন এবং দিনের অংশ রাতে প্রবেশ করিয়ে রাতকে বড় করে দেন। সবাই জানে, দিন-রাতের ছোট-বড় হওয়া সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কাজেই আয়াতের সারমর্ম হলো, নভোমণ্ডল, তৎসংশ্লিষ্ট সর্ববৃহৎ উপগ্রহ সূর্য ও চন্দ্র সবই আল্লাহর ক্ষমতাধীন। অতএব, উপাদান জগৎ ও অন্যান্য শক্তিও যে আল্লাহরই ক্ষমতাধীন, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। তিনি ইচ্ছা করলেই কাফিরের ঔরসে মুমিন অথবা মূর্খের ঔরসে বিদ্বান পয়দা করতে পারেন এবং ইচ্ছা করলেই মুমিনের ঔরসে কাফির এবং বিদ্বানের ঔরসে মূর্খ পয়দা করতে পারেন। তারই ইচ্ছায় আজরের ঘরে খলিলুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন এবং নূহ (আ) এর ঘরে তার ঔরসজাত পুত্র কাফির থেকে যায়। আলিমের সন্তান জাহিল থেকে যায় এবং জাহিলের সন্তান আলিম হয়ে যায়।

আয়াতে সৃষ্টজগতের ওপর আল্লাহর একচ্ছত্র ক্ষমতা কিরূপ প্রাঞ্জল ও মনোরম ধারাবাহিকতার সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে, উপরোক্ত বিবরণ থেকে সহজেই তা বোঝা যায়। প্রথমে উপাদান জগত এবং তার শক্তি ও রাজত্ব উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর নভোমণ্ডল ও তার শক্তি উল্লিখিত হয়েছে। সব শেষে আধ্যাত্মিকতার বর্ণনা এসেছে। প্রকৃতপক্ষে এটাই সব বিশ্বশক্তির মধ্যে সর্বোচ্চ শক্তি।

অবশেষে বলা হয়েছে, ‘আপনি যাকে ইচ্ছা অপরিমিত রিজিক দান করেন’। কোনো সৃষ্ট জীব তা জানতে পারে না- যদিও স্রষ্টার খাতায় তা কড়ায়-গণ্ডায় লিখিত থাকে।

0 মন্তব্যসমূহ

Thanks

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Thanks

Post a Comment (0)

নবীনতর পূর্বতন